বুধবার,৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ


বাবুল আক্তার ছুটিতে নেই, কর্মস্থলেও নেই


পূর্বাশা বিডি ২৪.কম :
২১.০৭.২০১৬

2621a8b55bf7f8a846f011d7c90d1e54-20-07-16-ILLUS-ALI-IMAM-MAZUMDAR

পূর্বাশা ডেস্ক:

শিরোনামটি মৌলিক নয়। প্রথম আলো থেকে ধার করা। বাবুল আক্তার নামটি ইতিমধ্যে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছে। তিনি একজন পুলিশ সুপার (এসপি)। চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে। পদোন্নতি পেয়ে হন পুলিশ সুপার। পরবর্তী নিয়োগের জন্য অপেক্ষমাণ ছিলেন পুলিশ সদর দপ্তরে। পরিবার ছিল চট্টগ্রামে। এমন সময়ে গত ৫ জুন তাঁর স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুন হন চট্টগ্রাম মহানগরের রাজপথে, প্রকাশ্যে। দুটি শিশুসন্তানের মা তিনি। স্বাভাবিকভাবেই এতে নিকটজন ছাড়াও সচেতন নাগরিকেরা ব্যথিত হন। আর অন্যান্য হত্যার চেয়ে এ বিষয়ে কিছুটা বিচলিতও হতে হয়। একজন পুলিশ সুপারের স্ত্রীও যে নিরাপত্তাহীন, এটা ভেবে শঙ্কিত হন অনেকে। নিছক গৃহবধূ এই নারীর মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত প্রথম দিকে একটু দ্রুতগতিই পেয়েছিল। এখন মনে হয়, সে গতি স্তিমিত হয়ে গেছে অন্তত কিছু মাত্রায়।
১৪ জুলাই প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক সংবাদে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, ‘তদন্তে বলার মতো অগ্রগতি নেই’। অবশ্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন আসামিকে। কাউকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কেউবা দিয়েছেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। আরও কয়েকজন আসামির রিমান্ডের আবেদন আদালতে বিবেচনাধীন। ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুজন আসামি নবী ও রাশেদ ৫ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ডের সংগঠক বলে পরিচিত অতিগুরুত্বপূর্ণ আসামি মুছা নিখোঁজ। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করছেন, মুছাকে ২২ জুন বন্দর এলাকার এক বাড়ি থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। অবশ্য এ দাবি অস্বীকার করছে পুলিশ। মুছার ‘নিখোঁজ হওয়া’ আর নবী ও রাশেদের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু এ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পর্কে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হওয়ার কথা।
বিষয়টি আরও জটিল হয় মামলার বাদী বাবুল আক্তারকে ২৪ জুন গভীর রাতে ঢাকায় তাঁর শ্বশুরালয় থেকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করাকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিনি ১৫ ঘণ্টা ছিলেন। জানা যায়, পুলিশের পদস্থ তিন কর্মকর্তা তাঁকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া পত্রপত্রিকার খবর অনুসারে, সে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি এ হত্যা মামলায় জড়িত আছেন বলে দাবি করা হয়। আরও বলা হয়, তাঁকে পুলিশ বাহিনী ছাড়তে হবে। নতুবা আসামি হতে হবে এ মামলায়। গণমাধ্যম দাবি করছে, তিনি পুলিশ বাহিনী ছাড়তে সম্মত হয়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের তৈরি করা একটি পদত্যাগপত্রে সই করেছেন। পদত্যাগপত্রটি আছে পুলিশ সদর দপ্তরের কারও না কারও হেফাজতে। এ জিজ্ঞাসাবাদের পর বাবুল আক্তারকে তাঁর শ্বশুরালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরেও যাচ্ছেন না। নেননি কোনো ছুটি। এ বিষয়ে কারও কোনো প্রশ্নের জবাবও দিচ্ছেন না তিনি বা তাঁর স্বজনেরা।

হত্যার ঘটনাটির মতোই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় বাবুল আক্তারকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও হত্যার ঘটনায় তাঁর কথিত সংশ্লিষ্টতা আর পদত্যাগের বিনিময়ে রেহাই পাওয়ার প্রস্তাব-সম্পর্কিত খবরে। বিশ্লেষকেরা বিভিন্ন ধরনের ধারণা করছেন। কারও কারও মতে, হত্যায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার খবর সঠিক। তবে আসামি করা হলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, এ বিবেচনাবোধ থেকে তাঁকে তা করা হচ্ছে না। বরং বাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়াই উত্তম বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করছে না। তারা বলছে, মামলার বাদী হিসেবে স্বাভাবিক নিয়মে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে মাত্র। তবে তাঁর পদায়নও হচ্ছে না। বিনা ছুটিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমনটাও জানা যায় না। অন্যদিকে কারও মতে, তিনি একজন চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য রেখে যাচ্ছেন। স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশ পদকও পেয়েছেন একাধিকবার। জঙ্গি দমনেও তাঁর দৃঢ় ও সফল ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। এ ধরনের সাফল্য আবার কোনো প্রভাবশালী মহলের ক্ষতির কারণও হয়ে যায়। তারা ভিন্নভাবে পথের কাঁটা অপসারণের উদ্যোগ নেয়। এতে অংশীদার পেয়ে যায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজ সহকর্মীদের একটি অংশকেও। তাই গোটা বিষয়টি এখনো রহস্যাবৃত।

যেটাই হোক, বাবুল আক্তারের স্ত্রী নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন, এটা সত্য। যে বা যারা এ খুনের পরিকল্পনা করেছে আর পালন করেছে এ দায়িত্ব, তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, এটা সবাই চায়। সে চক্রে যদি কোনো না-কোনো কারণে বাবুল আক্তার জড়িত থাকেন, তাঁকেও চাকরি থেকে পদত্যাগের বিনিময়ে রেহাই দেওয়ার সুযোগ নেই। আদালতও বিচার না করে কাউকে খালাস দেন না। প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ থাকলে তাঁকে আইনের আওতায় নেওয়াই যথার্থ। কারও কারও ধারণা, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন আসামির মৃত্যু আর একজন লাপাত্তা হওয়া মামলার প্রমাণাদি ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করার একটি অশুভ চেষ্টা।

একজন পুলিশ সুপার অপরাধ করলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি বিনষ্টের আশঙ্কায় ভিন্নভাবে রেহাই দেওয়া সুফল দেবে না। বরং এতে ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে আরও বেশি। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারাও এ ধরনের অপরাধ করলে চাকরিচ্যুত ও আদালতে বিচারের মুখোমুখি হন। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন আর চট্টগ্রামের আনোয়ারার একটি মাজারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়ে বিচারের আওতায় আছেন। বেসামরিক প্রশাসনে নিকট অতীতেই একাধিক সচিব কর্মরত থাকার সময়েই গ্রেপ্তার হয়েছেন। যেতে হয়েছে কারাগারে। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন কেন হবে, তা বোধগম্য হচ্ছে না। আর যদি হয়ও, তাহলে কাউকে হত্যার দায় থেকে আড়াল করার সুযোগ আছে কি?

আর যদি ব্যাপারটা না হয়? যদি তাঁকে বলির পাঁঠা করা হয়? পুলিশ বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের এটা ভেবে দেখতে হবে। দেখা যাচ্ছে, বাবুল আক্তারের শ্বশুরপক্ষ কোনো অবস্থাতেই তাঁকে দায়ী করছে না। সামান্য সন্দেহ থাকলেও তাদের সেটা করাই তো স্বাভাবিক ছিল। একজন চৌকস কর্মকর্তা অজ্ঞাত ‘কারণে’ বাধ্য হয়ে বাহিনী ত্যাগ করলে সে সংগঠনটি ও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি জঘন্য প্রকৃতির মন্দ নজির সৃষ্টি হবে। আর এসবের সূচনা হলে একজনে বা এক প্রতিষ্ঠানেই থেমে থাকবে না। জনপ্রশাসনের ভিন্ন আঙ্গিকেও এর প্রসার ঘটতে পারে। যদি এই কর্মকর্তা নির্দোষই হন, তবে মর্যাদার সঙ্গে তাঁকে চাকরি করতে দেওয়া যুক্তিসংগত। পুলিশ সুপার একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা। মাঠপর্যায়ে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বের পরিসরও তাঁর ব্যাপক। ক্ষমতা ও মর্যাদাও ভোগ করেন প্রভূত। এ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত জীবনে যখন গুরুতর একটি বিয়োগান্ত ঘটনা মোকাবিলা করছেন, তখন এর সঙ্গে তাঁর কোনো যথার্থ দায় না থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করা অমানবিক। আর দায় থাকলে চাকরি ছাড়ার শর্ত দিয়ে খুনের মামলা থেকে দায়মুক্তির চেষ্টাও অযাচিত ও বেআইনি।

এ দুর্ভাগা দেশটিতে অনেক বিয়োগান্ত ঘটনাই রহস্যের আড়ালে রয়ে গেছে। কোথাও বা ‘জজ মিয়া’ ধরনের চরিত্র সৃষ্টি করে সেদিকে দায় চাপানো হয়। আর এত দ্রুত যত সব ঘটনা ঘটে চলেছে, অতীতের এরূপ ১০-২০টি কোন দিকে গেল, তার খবরই-বা কে রাখে? আর রাখবে কত? মানুষের স্মৃতিশক্তির তো সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতা আছে এসব নিয়ে বলার ও লেখারও। গণমাধ্যম একটি বিষয় নিয়ে অবিরাম খবর প্রকাশ করলে পাঠকপ্রিয়তাও হারিয়ে ফেলবে। নতুন নতুন খবরই প্রাধান্য পায়। তাই তো ধীরে ধীরে হলেও স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ এমন অনেক কিছু। কুমিল্লায় তনু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রকৃতপক্ষে কোনো গতিই পেল না। ছয় দশক
আগে হলেও গল্প চালানো যেত মেয়েটিকে ভূতে মেরে ফেলেছে। আমরাও হয়তোবা বিশ্বাস করতাম। এখন তো শিক্ষার প্রসার, গণমাধ্যমের সক্রিয়তা আর দেশবাসীর সচেতনতায় ভূতের গল্পও চলে না। তবে যারা এসব আড়ালে নিয়ে যেতে চায়, তাদের প্রধান ভরসা, মানুষের স্মৃতিশক্তি ও ধৈর্য সীমিত।

এ দেশে একের পর এক মাটি কাঁপানো ঘটনা ঘটে চলেছে। তাই আগের অনেক ঘটনা তামাদি বলেই গণ্য হবে। আমাদের ভয় ও শঙ্কা, মাহমুদা খানম খুনের ঘটনাটি জজ মিয়া নাটক কিংবা তামাদির খাতাতেই না চলে যায়!



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি