শনিবার,২৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ


মারধর শেষে সেভেন-আপে মুখ ধোয়ানো, অতঃপর পুলিশ ‘বন্ধু’


পূর্বাশা বিডি ২৪.কম :
২৮.০১.২০১৭

278829_1
পূর্বাশা ডেস্ক:

ভিডিও জার্নালিস্ট আলিম চিৎকার করে বলে, ঈশান ভাই আমাকে বাঁচান। চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে যাই, বলি ভাই ওকে মারছেন কেন, আমার হাতের বুম (চ্যানেলের লোগোসহ মাইক্রোফোন) দেখিয়ে বলি আমরা সাংবাদিক, ওকে মারছেন কেন? সে কি দোষ করেছে আমাকে বলুন? ওরা (পুলিশ) কোনো উত্তর না দিয়ে পেছন থেকে একজন আমার মুখে ঘুষি মারে।

এরশাদ নামে একজন পুলিশ বলে, ওর হাতে মাইক্রোফোন আছে। সে রিপোর্টার, তার মুখে না মেরে পায়ে মারো। সাথে সাথেই একজন আমার উরুতে লাথি দেয়, আমি মাটিতে পড়ে যাই।

এভাবেই নিজের জীবনের এক দুঃসহ সময়ের বর্ণনা পরিবর্তন ডটকম প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন তরুণ সাংবাদিক কাজী ঈশান বিন দিদার।

ঈশান বলে যান-শাহবাগ থানার ভেতরে যে আমগাছ আছে তার একদিকে ক্যামেরাপার্সন আলিমকে মারতে থাকে অন্যদিকে আমাকে মারতে থাকে। কেউ তাদের (পুলিশ) হাতে যে লাঠি ছিলো তা দিয়ে মারে, কেউ পায়ের বুট দিয়ে পাড়ায়, কেউ ঘুষি দিতে থাকে।

আমাদের মুখ থেকে রক্ত ঝরছিল।

নির্যাতিত সাংবাদিক ঈশান।

এরপর পুলিশের আরও একটি নির্মম পরিহাসের বর্ণনা দেন ঈশান। বলেন, তারা (পুলিশ) সেভেন-আপ দিয়ে আমাদের মুখ ধুয়ে দেয় আর বলে, আরে মিডিয়াকর্মীদের সাথে তো আমাদের ভালো সম্পর্ক, সাংবাদিকরা আমাদের বন্ধু। এরপর তারা আমাদের পিজি হাসপাতালে পাঠাতে চায়। কিন্তু আমি রাজি হইনি। ততক্ষণে আমি আমাদের অফিসে জানাই, তখন অফিস থেকে ঊর্ধ্বতনরা এসে আমাদের নিয়ে যায়।

ঈশান আরও বলেন, এই মারধর কোনো ভুল বুঝাবুঝি নয়, এটা ইচ্ছাকৃত। কারণ আমি বারবার আমার হাতের বুম দেখিয়ে বলছিলাম আমার পরিচয়। তারপরও তারা ইন্টেনশনালি (উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে) এই নির্যাতন চালায়।

ঘটনা শুরু কীভাবে জানতে চাইলে ঈশান জানান, হাত ভাঙা একজন লোককে পুলিশ মারছিল। এটায় বাধা দিয়ে আরেকজন লোক জলকামানের ওপর উঠে যায়, টিয়ারশেলের কারণে ঠিকমতো তাকাতেই পারছিলাম না। কোনোরকমে দেখলাম ওই লোকটাকেও জলকামানের উপর থেকে টেনে নামিয়ে মারতে মারতে থানার ভেতর নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ক্যামেরাপার্সন এটার ছবি নিচ্ছিল, তখনই ক্যামেরাপার্সনের ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে তাকে থানার গেইটের ভেতর টেনে নিয়ে মারতে শুরু করে।

কোমরে ও পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে এখন বিছানায় পড়ে আছেন এ সংবাদ সৈনিক। আরো খারাপ অবস্থা এটিএন নিউজের ক্যামেরাপার্সন আলিমের। পরিবর্তনকে তিনি বলেন, পিঠের মধ্যে সমানে পাড়াইছে, খুব কষ্ট পাচ্ছি ব্যথায়।

পরিবর্তন ডটকমের কাছে সাংবাদিকদের ওপর এমন নির্যাতনের নিন্দা জানান জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন।

তিনি বলেন, ‘কোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে এ ধরনের আচরণ হতে পারে না। সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল।

পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে গায়ে পড়ে এসে সাংবাদিকদের পিটিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা গিয়েছিলো তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাংবাদিক ও পুলিশ ধক্কাধাক্কি বক্তব্যের প্রসঙ্গে ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘সারা দেশবাসী দেখেছে এটা ধাক্কাধাক্কি কি না! তাদের মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছে, তাদের চিকিৎসা চলছে।’

নির্যাতিত এটিএন নিউজের ক্যামেরাপারসন আবদুল আলীম

‘সবসময় এ ধরনের উদ্ভট কথা আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মুখেই শুনতে পাই, এর আগেও আমরা দেখেছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা উদ্ভট সব কথা বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেই তারা পুলিশকে বাঁচাতে উদ্ভট সব কথা বলা শুরু করে দেয় এটা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব’ বলেন তিনি।

বৃহস্পতিবারের হরতাল প্রসঙ্গে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণই ছিল, সেখানে কোনো ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেনি। তারপরও তাদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। তিনি বলেন, আমি এটাকে হামলাই বলবো যেভাবে টিয়ারশেল ছোঁড়া ও লাঠিপেটা করা হয়েছে। পুলিশের তো কাজ না যে তারা জনগণের উপর চড়াও হবে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার উপযুক্ত বিচার দাবি করেন এই সাংবাদিক নেত্রী।

সাংবাদিকরা যখন সংবাদ সংগ্রহে যায় তখন তাদের ওপর যদি নির্যাতন হয় এটা নিঃসন্দেহে লজ্জার বিষয়, সে ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে, বলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।

সাংবাদিকদের উপর যে নির্যাতন করা হয়েছে এটা একটা অপরাধ দাবি করে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর যে সমস্ত সদস্য এই কাজটা করেছে তদন্ত করে তাদের উপযুক্ত হওয়া উচিৎ।

বৃহস্পতিবার রামপাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে চলা হরতালের সময় সংবাদ সংগ্রহ করা অবস্থায় বেসরকারী টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজের ক্যামেরাপার্সন ও রিপোর্টারকে বেধড়ক মারধর করে রাজধানীর শাহবাগ থানার পুলিশ। মারধরের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হয়। শুক্রবার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার এক অনুষ্ঠানে এ ঘটনাকে ধাক্কাধাক্কি বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি