মঙ্গলবার,২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ


কোরবানির প্রেক্ষাপট


পূর্বাশা বিডি ২৪.কম :
২৪.০৮.২০১৭

পূর্বাশা ডেস্ক:

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ আরাফা ময়দানে এবং রাতে মুজদালিফা উপত্যকায় অবস্থানের মধ্য দিয়ে হজ পালনের মূল পর্ব শেষে ১০ জিলহজ সকালে মিনা প্রান্তরে পৌঁছে হাজীরা পশু কোরবানি দেন। সারা বিশ্বের মুসলমানরাও ১০ জিলহজ ঈদুল আজহা পালন করেন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভের আশায় কোরবানি করেন। কোরবান আরবি শব্দ, এর ফার্সি রূপ কোরবানি। অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য। বিশ্বজাহানের যিনি স্রষ্টা ও লালন-পালনকর্তা তিনি আল্লাহ। মানুষ তাঁর বান্দা, দাস। তবে দাস শব্দটি হীন-তুচ্ছ অর্থে ব্যবহৃত হয় বিধায় বান্দা শব্দটিই অধিক প্রযোজ্য।
পৃথিবীর সঙ্গে অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের দূরত্বের মতো স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির বা আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দূরত্ব কল্পনার ঊর্ধ্বে হওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু এ দূরত্ব অতিক্রম করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। বান্দা যখন পবিত্রতা অর্জন ও অজুর পর নামাজে দাঁড়ায়, তখন একেবারে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে যায়। এ সান্নিধ্যের মাত্রা নির্ণিত হয় প্রত্যেকে কতখানি একনিষ্ঠ ও ধ্যানে-জ্ঞানে আল্লাহতে সমর্পিত হতে পেরেছে তার ওপর। গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে এসি মার্কেটে ঢুকলে শীতল আমেজে আমাদের দেহ-মন শান্ত হয়ে যায়। হজের মৌসুমে মক্কা ও মদিনায় সেরূপ রহমতের আমেজে আল্লাহর সান্নিধ্যের উষ্ণতায় হাজীদের মন-প্রাণ ভরে যায়। তাওয়াফে, সাঈতে, আরাফায়, মুজদালিফায় সত্যিকার অর্থে আল্লাহ আর বান্দার মাঝে সব দূরত্ব দূর হয়ে যায়। মন-প্রাণ উদ্বেলিত হয় আল্লাহর সান্নিধ্যের চেতনায়।
সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারের কোনো দেশের রেডিও বা টিভি স্টেশনের খবর শুনি আমরা ঘরে বসে রেডিও-টিভি সেটে। শর্ত হলো, যন্ত্রগুলো ঠিক থাকতে হবে এবং টোনারটি ঘুরিয়ে স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। অনেক দূরের, একান্ত কাছের আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের জন্যও শর্ত হলো আমাদের হৃদয়ের যন্ত্রটি স্বচ্ছ-নির্মল থাকতে হবে, আর আল্লাহর স্মরণে গভীর মনোসংযোগ থাকতে হবে। এসব কিছু অর্জন করার জন্য একটি ধাপ অতিক্রম করা চাই। সেটি হলো ত্যাগ। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহকে রাজি করার উদ্দেশে, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা। আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান সবকিছু উৎসর্গ করতে পারলেই অর্জিত হতে পারে আল্লাহর দুর্লভ সান্নিধ্য। তখনই মানুষ আল্লাহর ওলি বা বন্ধুর মর্যাদায় উন্নীত হয়। এ ধরনের ত্যাগ ও উৎসর্গের অনুশীলনী ঈদুল আজহা ও কোরবানি। কোরবানির পেছনে আল্লাহর আদেশ পালনে ত্যাগের চেতনা কতখানি শানিত হতে হবে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈলের (আ.) জীবন।
আল্লাহর নবী ইবরাহিমের (আ.) আগমন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে। জীবনের প্রতি পদে তাকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে আল্লাহর আদেশ পালনে, তাঁর সান্নিধ্য অর্জনে। প্রথমে বাবেল শহরে (ইরাক অঞ্চলে) খোদাদ্রোহী শাসক নমরুদের বিরুদ্ধে একাকী লড়াই, মূর্তিপূজার বিরোধিতা করতে গিয়ে বিশাল অগ্নিকু-ে নিক্ষিপ্ত হওয়া, আল্লাহর আদেশে অগ্নিকু- প্রশান্ত ফুলবনে পরিণত হওয়া আর নমরুদ ধ্বংস হওয়ার পরও জনগণ ঈমান না আনলে মিসরে গমন। লম্পট বাদশাহর কুদৃষ্টি থেকে অলৌকিকভাবে তার স্ত্রী বিবি সারার মুক্তি এবং বাদশাহর ভক্তি-প্রণতির নিদর্শনস্বরূপ বিবি হাজেরাকে দাসী হিসেবে তাদের কাছে উৎসর্গ করা, কেনান বা বর্তমান ফিলিস্তিন পৌঁছে দাসী ও পরে স্ত্রী হাজেরার ঘরে পূর্ণিমা শশী হয়ে ইসমাঈলের জন্মলাভ, মানবীয় স্বভাবের প্রতিক্রিয়ায় দুই স্ত্রীর মাঝে কলহ প্রভৃতি সবই ছিল ইবরাহিমের (আ.) জন্য একেকটি কঠিন পরীক্ষা।
ধৈর্যের পাহাড় ইবরাহিম (আ.) এসব পরীক্ষায় সফলকাম হন আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিবেদিত চিত্তে। পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় আদেশ হলো বিবি হাজেরাকে নবজাতক ইসমাঈলসহ নির্বাসন দিতে হবে আরবের পানি ও তরুলতাহীন পাহাড়ঘেরা বিজন মরুতে। এরই ফলে গড়ে উঠেছে কাবাঘর, জমজম, সাফা-মারওয়া ও হেরেম শরিফ। মক্কায় বেড়ে ওঠা ইসমাঈল যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে পৌঁছল তখন স্বপ্নে আদেশ এলো, ইবরাহিম তোমার প্রিয়তম বস্তু কলিজার টুকরা ছেলেকে আমার উদ্দেশ্যে জবাই করো। স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ইবরাহিম (আ.) ছেলেকে প্রস্তাবটি দিলেন, ছেলেও সানন্দে জবাই হতে রাজি হলেন, তার গলায় ধারালো ছুরি চালানো হলো, পরে পাহাড় থেকে নেমে আসা বেহেশতি দুম্বা ইসমাঈলের পরিবর্তে জবাই হলোÑ তার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা রয়েছে কোরআন মজিদের সূরা সাফফাতে। (আয়াত : ১০২-১০৫)।
এ ঘটনার অনুকীর্তি হলো হজের পর মিনায় ও ঈদুল আজহা শেষে সারা দুনিয়ায় মুসলমানদের ঘরে ঘরে কোরবানি। উদ্দেশ্য, সবাই যেন ইবরাহিম, ইসমাঈল ও মা হাজেরা (আ.) এর জীবনকে চেতনায় এবং জীবনের বাস্তবতায় মেনে চলে। তাদের যে জীবন, পদে পদে পরীক্ষায় খোদাদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, মিনায় কুমন্ত্রণাদানকারী শয়তানকে পাথর মারার চেতনাÑ এরই নাম ইসলাম। সালাম মানে শান্তি আর ইসলাম মানে আনুগত্যে আত্মসমর্পণ।
ইসলামের আসল প্রবর্তক ইবরাহিম (আ.)। তিনিই আমাদের আখ্যায়িত করেছিলেন মুসলমান হিসেবে। কাজেই মুসলমান হতে হলে তাগুতকে অস্বীকার করতে হবে। শয়তানকে ঘৃণার পাথর ছুড়তে হবে। পারিবারিক অশান্তিতেও চরম ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহর আদেশ পালনের পরীক্ষায় নিজের স্ত্রী-পুত্রকে সঁপে দিতে হবে।

পূর্বাশানিউজ/২৪আগষ্ট ২০১৭/রুমকী



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি