বৃহস্পতিবার,৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ


বিএনপির নতুন কমিটিতে উত্তরাধিকারীদের ছড়াছড়ি


পূর্বাশা বিডি ২৪.কম :
০৮.০৮.২০১৬

2016_08_07_12_34_57_gQTkYXGazVLW1lkcPtwIhVVOWPOPIg_original-550x309পূর্বাশা ডেস্ক:

বিএনপির নতুন কমিটিতে নেতাদের উত্তরাধিকারীদের ছড়াছড়ি। কমিটি গঠনে খালেদা জিয়া পারিবারতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নেতার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, পুত্রবধূ, ভাতিজা, ভাই, ভগ্নিপতি এমন কাউকেই বাদ দেননি। যাকে যে পদে পেরেছেন সম্পৃক্ত করেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে যারা কমিটিতে এসেছেন তাদের কয়েকজন ছাড়া রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদৌ তাদের রাজনৈতিকভাবে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। দলের জন্য কোনো অবদান আছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপির জন্য তারা আগামী দিনে কী কাজে লাগবেন তাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির একটি সূত্রে জানা গেছে, যেসব নেতারা মারা গেছেন বা নিখোঁজ আছেন তাদের বেশ কয়েকজন পরিবারের সদস্যকে আনা হয়েছে। এসব নেতাদের সন্তুষ্ট করতেই এটা করা হয়েছে। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে দ-িত হওয়া নেতার ছেলে ও ভাইও ঠাঁই পেয়েছেন কমিটিতে। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের একটি সূত্র জানায়, নতুন কমিটিতে একই পরিবারের দুই-তিনজন করে সুযোগ পাওয়ার কারণে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতা কমিটিতে ঠাঁই পাননি। এটা ঠিক হয়নি। এক নেতা এক পদ পাবেন সেটাই সিদ্ধান্ত ছিল। একাধিক পদে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে না এমন সিদ্ধান্তও ছিল। কিন্তু সেটাও শেষ পর্যন্ত টিকেনি। একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে সুযোগ দিতে গিয়ে দলীয় রাজনীতিকে পারিবারতন্ত্রের মধ্যে বন্দি করেছেন খালেদা জিয়া।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারী হিসেবে খালেদা জিয়া দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর সবসময় কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হয়েছেন। তার অবর্তমানে আগামী দিনের জন্য উত্তরাধিকারী তারেক রহমানকেই হাইকমান্ড পদে বসানোর জন্য সব প্রক্রিয়া খালেদা জিয়া সম্পন্ন করে রেখেছেন। দলের কারও কারও মধ্যে বিশেষ করে সিনিয়র নেতাদের অনেকের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। তারা এটা মানতে পারছেন না। তাদের কথা হলোÑ যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতা নির্বাচন করতে হবে এবং তা হতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার ছেলেকেও উত্তরাধিকারী হিসেবে তারেক রহমান নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিনকে নতুন কমিটিতে রাখা হয়েছে। কিছুদিন আগে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। ভাই ছাড়াও ফখরুলের ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আগে ছিলেন। এবারও হয়েছেন। যদিও তার ব্যাপারে তারেক রহমানের ক্ষোভ রয়েছে। সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুকে এবারও নির্বাহী সদস্য পদে রাখা হয়েছে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া কমিটিতে পছন্দমতো নেতা বাছাই করার কারণে অনেক যোগ্য নেতাই বাদ পড়েছেন কমিটি থেকে। আবার যেখানে কমিটিতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতা সুযোগ পাচ্ছেন না, সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের সন্তান, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, এমনকি পুত্রবধূকেও ঠাঁই দেওয়া হচ্ছে কমিটিতে। যেসব নেতারা মারা গেছেন তাদের উত্তরাধিকারীদের ছাড়া যেসব নেতা জীবিত আছেন এবং এখনো পদে আছেন ওই কয়েকজন নেতার উত্তরাধিকারীকেও আনা হয়েছে কমিটিতে। ফলে এ নিয়ে পদ বঞ্চিত নেতাদের ক্ষোভ রয়েছে। তারা মনে করছেনÑ একজন নেতাকে পদ দেওয়ার পর তার উত্তরাধিকারীকে একই সময়ের একই কমিটিতে পদ দেওয়া হলে দলের ভেতরে পারিবারিক রাজনীতির আবহ তৈরি হয়। বিএনপি এর আগেও এটার চর্চা করেছে। তবে এবার বেশি।

এর আগে বি. চৌধুরীর পাশাপাশি তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরীও বিএনপির সুবিধা নিয়েছেন। এবার প্রয়াত বিএনপি নেতা ওবায়েদুর রহমানের কন্যা শামা ওবায়েদও নতুন কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। তবে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে পদ পাওয়াটি ছিল বাবার অনুপস্থিতি। তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক।

কিন্তু এবার এমন অনেকেই ঠাঁই পেয়েছেন যেখানে নেতা আছেন আবার তার উত্তরাধিকারীও আছেন। এমন তালিকায় রয়েছেন একাধিক নেতা। এছাড়া ২০ দলীয় জোটের শরিক ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল)-এর সাবেক সভাপতি অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমি ফারাহানাকে সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে।

বিএনপির নতুন কমিটিতে পরিবারতন্ত্রের যে চর্চা তাতে দেখা গেছে, সিনিয়র অনেক নেতার ছেলে-মেয়ে আত্মীয়স্বজন নতুন কমিটিতে রয়েছেন। তারা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদও দখলে নিতে পেরেছেন। এই ক্ষেত্রে রয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলামের ছেলে শাহরিন ইসলাম তুহিন, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে নিপুন রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান মীর নাছিরউদ্দিনের ছেলে মীর হেলালউদ্দিন, স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন, তিনি সুপ্রিম কোর্টের নবীন আইনজীবী খন্দকার মারুফ হোসেন। তারেক রহমানের আইনজীবী।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়কে প্রান্তিকে ও জনশক্তি উন্নয়নবিষয়ক সহ-সম্পাদক করা হয়। তার পুত্রবধূ নিপুন রায় চৌধুরীকে কার্যনির্বাহী সদস্য করা হয়েছে। মির্জা আব্বাসের স্ত্রী সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আফরোজা আব্বাস, সাবেক কমিশনার মির্জা আব্বাসের ছোট ভাই মির্জা খোকন কার্যনির্বাহীর সদস্য হিসেবে নতুন কমিটিতে পদ পেয়েছেন। আফরোজা আব্বাসকে সহ-মহিলাবিষয়ক সম্পাদক করা হয়েছে।

বাবার পদে মেয়ে রয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনার রশীদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খান রিতা খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই পেয়েছেন। এবার ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারী বিবেচনায় কমিটিতে আনা হয়েছে। এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হয়েছেন। বিএনপির আরেক নেতা ছিলেন নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। তিনি বন্দি অবস্থায় মারা যান। নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আখতার কল্পনাকে নতুন কমিটিতে রাখা হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক করা হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ ইসলাম অমিতকে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়ার স্ত্রী সাহিদা রফিক উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পেয়েছেন।

বাদ যাননি মানবতাবিরোধী অপরাধে দ-িত ও রায় কার্যকর হওয়াা নেতার উত্তরাধিকারীও। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে এবং নতুন কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরীর ভাতিজা হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে পদ দেওয়া হয়েছে। হুম্মাম কাদের চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছেন। সালাউদ্দিন কাদেরের ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়েছে। একই অপরাধে আমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্ত প্রয়াত যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমকেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হয়েছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নানের মেয়ের জামাই নাসির উদ্দিন অসীম উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। প্রয়াত হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরীকে নির্বাহী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত এম শামসুল ইসলাম খানের ছেলে মইনুল ইসলাম শান্তকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ সহ-তাঁতিবিষয়ক সম্পাদক, সাবেক গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের ভাই আনোয়ার হোসেন বুলু নির্বাহী সদস্য, সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমানের ছেলে নাসের রহমানকে সদস্য পদে রাখা হয়েছে।

বিএনপির সিনিয়র একজন নেতা বলেন, যেসব উত্তরাধিকারীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিএনপির কমিটিতে সম্পৃক্ত করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগেরই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। কয়েকজন মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী একজন। তিনি অনেক দিন ধরেই কাজ করছেন। বাকিরা রাজনীতিতে নতুন। এই সব ব্যক্তিরা আগামী দিনে দলের জন্য কাজ করবেন নাকি কেবল পদ অলঙ্কিত করে থাকবেন সেটা হবে দেখার বিষয়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একটি সংগঠনের নেতা হওয়ার জন্য যেসব যোগ্যতা প্রয়োজন সে সব বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই কমিটি গঠন করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন। তাছাড়া রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। ছাত্রদল-যুবদল থেকেও নেতারা আসছেন। তাদের আগামী দিনের জন্য তৈরি করতে নতুন কমিটিতে আনা হয়েছে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি